তবে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন বিশ্ব অর্থনীতিতে যোগ হতে পারে প্রায় ৪১ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ব্যাংক ইউবিএসের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বকাপ এখন শুধু ফুটবলের উৎসব নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। খবর ফ্রান্স টোয়েন্টিফোর।
এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। তিন দেশে ছড়িয়ে থাকা ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচগুলো। আয়োজক দেশ, স্পন্সর, সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান, পর্যটন খাত, হোটেল, পরিবহন ও খুচরা ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে এর অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক সপ্তাহের ফুটবল উন্মাদনা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করবে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০০ কোটি মানুষ এ টুর্নামেন্ট অনুসরণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া সরাসরি খেলা দেখতে প্রায় ৬৫ লাখ দর্শক স্টেডিয়ামে উপস্থিত হতে পারে।
ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) যৌথ এক গবেষণায়ও একই ধরনের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২০২৬ বিশ্বকাপ বৈশ্বিক জিডিপিতে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলারের বেশি যোগ করতে পারে। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিতেই প্রায় ১ হাজার ৭২ কোটি ডলার যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক প্রভাবের বড় অংশ আসবে পর্যটন ও ভোক্তা ব্যয় থেকে। বিভিন্ন দেশ থেকে লাখো দর্শক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় ভ্রমণ করবেন। তারা হোটেলে থাকবেন, রেস্তোরাঁয় খাবেন, স্থানীয় পরিবহন ব্যবহার করবেন এবং বিভিন্ন পণ্য কিনবেন। এসব ব্যয় সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ট্রাভেল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, বিদেশী দর্শক যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে গড়ে ৫ হাজার ডলারের বেশি ব্যয় করতে পারেন। ফলে আতিথেয়তা, হোটেল, বিমান পরিবহন, খুচরা বিক্রয় ও বিনোদন খাতে বড় ধরনের আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এরই মধ্যে কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অবসর ও আতিথেয়তা খাতে নিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, বিশ্বকাপকে ঘিরে প্রত্যাশিত পর্যটক প্রবাহের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম কর্মী নিয়োগ শুরু করেছে।
বিশ্বকাপ চলাকালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি বাড়বে আয়োজক শহরগুলোয়। এর মধ্যে রয়েছে আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হিউস্টন, কানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস, নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া, সিয়াটল ও সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া।
ডিজিটাল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সোফাইয়ের গবেষণা বলেছে, প্রতিটি আয়োজক শহরে অতিরিক্ত ১৬-৬২ কোটি ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন কোম্পানিগুলো এ বাড়তি চাহিদার সুবিধা পাবে।
অন্যদিকে ব্যাংক অব আমেরিকার বিশ্লেষণে বলা হয়, ২০২৬ বিশ্বকাপ প্রায় ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এটি হতে যাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যুগের প্রথম বিশ্বকাপ। দর্শক অভিজ্ঞতা, ম্যাচ বিশ্লেষণ, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়ন ও সম্প্রচার প্রযুক্তিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়বে। ফলে প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক সেবার বাজারও সম্প্রসারণ হতে পারে।
ইউবিএসের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ফুটবল এখন ধীরে ধীরে একটি বৃহৎ বিনিয়োগ খাতে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ এ খেলার সঙ্গে যুক্ত। দর্শকসংখ্যা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনার দিক থেকে অন্য কোনো খেলাধুলা ফুটবলের কাছাকাছি নেই।
ব্যাংকটির মতে, ফুটবল খাতে মালিকানার কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। আগে ক্লাবগুলো মূলত ব্যক্তি বা পারিবারিক মালিকানার অধীনে থাকলেও এখন সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ও জটিল আর্থিক কাঠামোর ব্যবহার বাড়ছে। ফলে ফুটবল ক্লাবগুলো বিনিয়োগ তহবিল ও বৈশ্বিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কাছে আকর্ষণীয় সম্পদে পরিণত হয়েছে।
ফুটবল আর শুধু টিকিট বিক্রি, সম্প্রচার স্বত্ব বা স্পন্সরশিপ আয়ের ওপর নির্ভর করছে না। বরং এটি এখন বহুমুখী ব্যবসায়িক খাতে রূপ নিয়েছে। ডিজিটাল কনটেন্ট, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তি সেবা ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ড সঙ্গে অংশীদারত্ব থেকেও আয় বাড়ছে।
ফুটবলের বাণিজ্যিক শক্তির একটি চিত্র পাওয়া যায় শীর্ষ ক্লাবগুলোর আয়ে। ইউবিএসের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ২০টি ফুটবল ক্লাবের মোট আয় ১ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব। ক্রীড়া আয়োজন হলেও এর সুফল পর্যটন, প্রযুক্তি, অবকাঠামো, খুচরা ব্যবসা, গণমাধ্যম, পরিবহন ও আর্থিক সেবাসহ বহু খাতে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে বিশ্বকাপ এখন শুধু মাঠের লড়াই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি বড় প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে ধীর প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৬ বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ভোক্তা ব্যয় ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।